এক প্রেমিকার চিঠি

#এক_প্রেমিকার_চিঠি
#শম্পা_সাহা

খুব যন্ত্রনা হয় জানিস।না শরীরের নয় মনের।শরীর তো একদিন শেষ হবেই ।আর শরীরের যন্ত্রনা কমানোর ওষুধও আছে কিন্তু মনের?মনের যন্ত্রনা কমাবার ওষুধ কই?

শরীরের চাহিদা মেটানো যায় সহজেই।চাইলেই শুয়ে পড়া যায় যার তার সাথে কিন্তু মন?মন কি তাতে সায় দেয়?দেয় না?

তাই মন সাড়া না দিলে শরীরও সাড়া দেয় না।যে মেয়েটা রোজ শরীর বেচে তাকে জিজ্ঞাসা করে দেখিস,প্রথম প্রথম তার মনহীন শরীর দিতে কষ্ট হয় খুব, পরে এক সময় সে মনটা মেরে ফেলে।আর শরীর?সে তো তখন যন্ত্র!তার আর ভালো মন্দ,চাওয়া না চাওয়া!যন্ত্র কি তার ইচ্ছে জানায়?না।কাজ করে চলে অবিরত!শেষে একদিন যখন শেষের ঘন্টা বাজে ,তার কাজ ও শেষ হয়।

এই যে গত কদিন ধরে হাসপাতালের বেডে,একাকী, নিঃসঙ্গ।আমার শ্বাসে বিষ,তাই প্রিয় জনেরা আসবে না কাছে।দূর থেকে দেখার ও অনুমতি নেই।ধীরে ধীরে আমার এ পৃথিবীতে শ্বাস নেবার মেয়াদ ফুরিয়ে আসছে।আমার জন্য বরাদ্দ বাতাস সবটুকুই খরচ করে ফেলেছি যে।আজ আমি খরচের খাতায়!

হাজার রকম নল লাগানো, হাজারটা সুঁচ ফুঁটছে শরীরের আনাচে কানাচে।নাঃ!কোনো যন্ত্রনা নেই।কারণ যন্ত্রনা অনুভব করার ক্ষমতা তো আমার চলে গেছে কবেই।

জানিস হাত তুলতে পারছি না,লিখতে গেলে ভুলভাল টাইপ হয়ে যাচ্ছে।মাথা ভার,চোখ বুজে আসছে।বুকের ভেতর এক অদ্ভূত চাপ,যেন আর জায়গা নেই।হৃৎপিণ্ড জানান দিচ্ছে কাজ শেষ করো তাড়াতাড়ি!আমি আর এক মহুর্ত সময় চেয়ে নিলাম।

শেষ বার আকাশ দেখছি।কি সুন্দর নীল।যদিও আমার বেডটা জানালার পাশে নয় তবু চোখ ফেরালেই চোখে পড়লো।কি একটা পাখি উড়ছে!কিন্তু দৃষ্টি অতদূর যায় না যে!

কেবিনের এককোণে একগোছা সাদা গোলাপ।তুই তো জানিস গোলাপ আমার কত প্রিয় ।কিন্তু এই শেষ সময়ে তার গন্ধটুকুও পেলাম না।

চোখের সামনে ঝাপসা হয়ে আসছে,মোবাইল স্ক্রিন যেন অন্ধকার।এক একটা শব্দ লিখছি আর বালিশে মাথা গুঁজে আরো দুয়েকটা শ্বাস বায়ু কুড়িয়ে নিচ্ছি।

আমার শিউলি গাছ,আমার ছাদের পাশের টবের গন্ধরাজ,আমার গোলাপ বাগানে ফেরা হবে না কোনদিন।হয়তো শ‍্যাওলা গজাবে আমার সাধের বাঁধানো বেদিতে।যেখানে বসে আমি মনে মনে তোকে কত চিঠি লিখেছি।

ঘরের আনাচে কানাচে ধুলো আমার মোটেও পছন্দ নয় কিন্তু জানি এই কদিনেই জমেছে ধুলো! মাকড়সা এক পা এক পা করে দখল নিচ্ছে আমার অধিকারে।

আর পারছি না,হাত কাঁপছে। শুধু এটুকু বলেই শেষ করি,আমি বাঁচতে চেয়েছিলাম, থাকতে চেয়েছিলাম আমার ঘরের কোণটা জুড়ে আর তোর মনেও।কিন্তু পারলাম না।

সবাই ভালো থাকিস।আর হ‍্যাঁ এখুনি ভুলতে বসেছিলাম, তুই আমায় ভালোবাসিস না জানি কিন্তু আজও আমি তোকেই ভালোবাসি।

মোবাইলের স্ক্রিন কালো হয়ে এলো।কিছুক্ষণ পর,একজন নার্স এসে পাল্স দেখে বললেন,”পেশেন্ট পার্টি দুশো বারো,বাড়ির লোককে খবর দিন!এই সব সাপোর্ট সিস্টেম খুলে নাও।”

ডাক্তার চিৎকার করছেন,” কি ব‍্যাপার এতক্ষণ হয়ে গেল,এখনো লাশ সরানোর ব‍্যবস্থা হলো না কেন?”

©®

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top