কবির বন্ধু

অণুগল্প —- কবির বন্ধু – সুব্রত সরকার

গত তিন চারদিনের মেসেজগুলো আনডেলিভার্ড সিঙ্গল টিক হয়ে পড়েই রয়েছে! হঠাৎই এটা খেয়াল হল কমল শূরের। স্বল্প পরিচয়, দূরের বন্ধু, হোয়াটসঅ্যাপে অনিয়মিত যোগাযোগ, তবু বন্ধুত্বটা আলো- জল- বাতাস পেয়ে বেশ আছে!

কমল নতুন লেখা হলেই দু’চারজন প্রিয় মানুষজনকে পড়ার জন্য পাঠিয়ে দেন। প্রকাশিত হওয়ার আগেই নতুন টাটকা লেখা পড়ে সে সব বন্ধুজন, প্রিয়জনেরা মতামত জানায়। এটা কমলের একটা বড় প্রাপ্তি।

এবারের নতুন কবিতাটা কমল কয়েকদিন আগে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন স্বর্ণালী দের হোয়াটসঅ্যাপে। ভদ্রমহিলা ভালো পাঠিকা। নিজের মতামত বেশ সুন্দর গুছিয়ে লিখে জানান। কিন্তু কথা বলায় ততটা সাবলীল নন। একটু লাজুক ও কম কথা বলাই যেন পছন্দ করেন।

কমল বাড়িতেই বন্দী এখন। চারপাশে মহামারীর আতঙ্ক। লকডাউনের ঘেরাটোপে জীবন অতিষ্ঠ। নিজের পড়ালেখা নিয়েও শান্তিতে থাকতে পারছেন না। মনের ভেতর গোপন এক ভয় প্রতিদিনের যাপনটাকে তছনছ করে দিয়েছে।

মোবাইল হাতে নিয়ে বসে বসে ভাবছেন, একবার ফোন করলে হয় স্বর্ণালী দে কে। কি খবর? কেমন আছেন? আবার একটু সঙ্কোচও হচ্ছে। এমন হঠাৎ ফোন করা ঠিক হবে কিনা ভেবে। তবু ফোনটা করেই ফেললেন। রিং হয়ে হয়ে থেমে গেল। কমল একটু আশাহত হয়ে ফোনটা রেখে দিযে বারান্দায় গিয়ে একটু দাঁড়াবেন ভাবছেন, সে সময় ফোনটা বেজে উঠল। স্বর্ণালী দে কল ব্যাক করেছেন দেখে একটু হেসে বললেন,” আপনি কেমন আছেন? হোয়াটসঅ্যাপে আমার মেসেজগুলো আনসিন, ডেলিভার্ড না হয়ে পড়ে আছে দেখে ভাবলাম, কি খবর আপনার!.. একটু চিন্তা করছিলাম!”…
“আপনি কে বলছেন?” অন্য নারী কন্ঠের শান্ত জিজ্ঞাসা।
কমল থতমত খেয়ে বললেন,” আমি স্বর্ণালী দের পরিচিত। বন্ধু বলতে পারেন। একটু লেখালেখি করি। আমার কবিতা ওঁকে পাঠাই। আমার কবিতা পছন্দ করেন পড়তে।”…
” ও আপনিই কমল শূর?”
” হ্যাঁ। ”
” আপনার শেষ কবিতাটা মা পড়ে যেতে পারে নি।”
” মানে!”
” মা হঠাৎই চলে গেল! “…
” সে কি! এই মহামারীই কি….”
” হ্যাঁ। তিনদিনের জ্বরে মা চলে গেল!”

কমল স্তব্ধ। ফোন বিচ্ছিন্ন হয় নি। একটু পর আবার ভেসে এল,”আপনার কবিতাটা আমি পড়েছি। ভালো লেগেছে।”
কমল চুপ করেই আছেন। কথা খুঁজে না পেয়ে বোবা যন্ত্রণায় নীরব। ফোনে ওপ্রান্ত থেকে এবার ভেসে এল,” আমিও মায়ের মত সাহিত্য ভালোবাসি। যদিও পড়াশোনা করি অন্য বিষয় নিয়ে। আমার নাম বর্ণালী। আপনি মনে করলে আমাকেও পাঠাতে পারেন আপনার কবিতা। আমি পড়ব।”
কমল স্বর্ণালী কে পাঠানো শেষ কবিতাটার কয়েকটা পংক্তি মনে করার চেষ্টা করছে,” কথা শব্দ সৃষ্টি করে / সেই শব্দ কখনো কখনো নীরবতাকেও হার মানিয়ে দেয়….”

স্বর্ণালী এই কবিতাটা না পড়েই চলে গেলেন না ফেরার দেশে! বর্ণালী পড়েছে। ভালো লেগেছে, সে কথা জানাতেও দ্বিধা করে নি। “কবিতা বন্ধু এনে দেয়, বন্ধু আরও নতুন বন্ধুর জন্ম দিয়ে যায়!…

কমলের নতুন কবিতা আসছে… ভাবনায় ভিড় করে আসছে পরের পংক্তিগুলো!….

।। সমাপ্ত।।

সুব্রত সরকার

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top