কবি ও কবিতা

নিবন্ধ
কবি ও কবিতা
শংকর ব্রহ্ম
—————————-

(১).

“কবি কোন তকমা নয়
কবি বিশেষ এক পরিচয়,
মনের ভাব যার কথায়
ছন্দে চিত্রে প্রকাশ পায়।”

সব বিদ্যে শেখানো যায়, কবিতা লেখা শেখানো যায় না। ওটা যার হয় তার হয়,
ভিতরের ব্যাপার( অনুভূতির তীব্র আবেগে, প্রকাশের তাগিদ)। তবে আজকাল বানানো কবিতার ছড়াছড়ি,চোখে পড়ে।
কবিতা আসে স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে,
ছন্দ মাত্রা তাল লয় ভেবে আসে না। কবি অনেক সময় তা নিয়ন্ত্রণ করে, তার জ্ঞান বুদ্ধি শিক্ষা দিয়ে, কবিতা সে নিয়ন্ত্রণে, অনেক সময় শ্বাসরুদ্ধ হয়ে পড়ে।
ভিতরে কবিত্ব বোধ থাকলে তবেই কবিতা হবে
নতুবা সবটাই ফাঁকি যাবে।
বিদেশে কবিতা লেখা শেখাবার কিছু স্কুল আছে, সেখানে লেখা শিখে কেউ বড় কবি হতে পেরেছেন বলে শোনা যায়নি।
সুনীল গাঙ্গুলী , সমরেন্দ্র সেনগুপ্তরাও কলকাতায় সে রকম একবার চেষ্টা করেছিলেন , কৃত্তিবাস পত্রিকার পক্ষ থেকে , সে প্রচেষ্টা সফল হয়নি।
কোন সৃষ্টিশীল কবি তৈরী করতে সৃষ্টি হয়নি , সেই পরিকল্পনা থেকে, ফলে তা স্বল্পকালের মধ্যেই পরিত্যাজ্য হয়েছিলো।
ফরাসী কবি মালার্মে বলেছেন , কবি আসলে নিজের সাথে কথা বলেন, পাঠক শ্রোতারা আড়ি পেতে তা শোনেন।

(২).

কবিতা সরাসরি কথা বলে না। কবিতা লেখা হয় সান্ধ্যভাষায়, তাই বহুক্ষেত্রে
কবিতার ভাষা ইঙ্গিতবাহী, শঙ্খ ঘোষ যাকে বলেছেন, কবিতার অবগুন্ঠণ।
সে ইঙ্গিত সূক্ষ্ম হতে পারে, আবার স্থুলও হতে পারে।
স্থুল ইঙ্গিত নিয়মিত কবিতার পাঠকেরা সহজেই ধরতে পারেন,বুঝতে পারেন।
সূক্ষ্ম ইঙ্গিত সকলের পক্ষে বোঝা সম্ভব নয় বলে, সে’সব কবিতাগুলো দুরূহ মনে হয়, তাদের কাছে। দুর্বোধ্যতা ভিন্ন ব্যাপার।
সূক্ষ অনুভূতিতন্ত্রের লোকেরা নিশ্চয়ই বুঝতে পারে সে’সব লেখা, অবশ্য তাদের সংখ্যা খুবই কম।
কবিতার ভাষা যেহেতু ইঙ্গিতবাহী সেকারণে – রূপক, চিত্রকল্প, উৎপ্রেক্ষণ,
নিপুন শব্দ ব্যাবহারের নিপুন দক্ষতা, সব কিছুই বিশেষ ভাবে ফুটে ওঠে কবির কবিতায়।
অবশ্য কবিতা লেখার সময় এতসব ভেবে কবিতা লেখা হয় না। লেখা যায় না।
কবিতা লেখার পূর্বেই এইসব নির্ধারিত প্রক্রিয়াগুলে চলতে থাকে নিঃশব্দে, ভিতরে ভিতরে।এইসব প্রক্রিয়াগুলো, মানসিক ভাবে কবিকে তৃপ্ত করলে, তবেই একটি কবিতা ভূমিষ্ট হবার সুযোগ পায়।
কবি তার প্রয়োজনে তার কবিতায় ছন্দকে ব্যবহার করেন , অবশ্য সর্বদাই সে ছন্দের অনুশাসন মেনে চলেন, এমন নয়।কোথায়ও ছন্দের একচুল কম বেশী হলে, তিনি গায়ে মাখেন না। কবির মূখ্য লক্ষ্য থাকে কবিতাটির সুষ্ঠ বিন্যাস। তিনি মনে করেন,
ছন্দ যদি পুরোপুরি কবিতাকে শাসন করে, তবে অনেক সময়, কবিতার স্বতঃস্ফূর্ততা নষ্ট হয়ে যায়। কবিতা খর্ব হয়ে পড়ার সম্ভবনা থেকে যায়।
অবশ্য ছান্দসিকের সেটা মনঃপূত
হতে না পারে, তাতে কবির কিছু এসে যায় না।
ছান্দসিকরা ভুলে যান, কবিতার জন্যই ছন্দ, ছন্দের জন্য কবিতা নয়। ছন্দ কবিতার এক প্রকারের বাহন মাত্র, তার বেশী কিছু নয়।
ছন্দ মানুষকে বেশী মাতাতে পারে, তার একটা চুম্বক আকর্ষণ আছে,যে আকর্ষণ যেকোন প্রাণীকেই অমোঘ ভাবে টানে।যেমন বাঁশির সুরে সাপ মোহগ্রস্ত হয়ে পড়ে। পাঠকরাও ছন্দে মোহগ্রস্ত হয়ে পড়ে। তাই কবিতায় ছন্দ অপরিহার্য না হলেও কাঙ্খিত। কারণ, তাতে সহজেই মানুষের মনে দোলা দিয়ে, কবিতার রস সঞ্চারে সহজ সহায়তা করে।
কবি জীবনানন্দ দাশ মনে করতেন,
কোন কবিতা ছন্দে লেখা হবে, তা ভিতরে ভিতরেই ঠিক হয়ে যায়, কবিতাটি ভূমিষ্ট হবার পূর্বেই।
প্রত্যেক মনীষারই এক বিশেষ ক্ষমতা থাকে, সে তার নিজের জগতে সিদ্ধ,কবির সিদ্ধিও তার কাব্য সৃষ্টির ভিতরে। অবশ্য তার মানে এই নয় যে কবি ব্যবহারিক জীবনে অকর্মণ্য, বরং সাধারণ বুদ্ধিমান লোকের মত, সে তার ব্যবহারিক প্রয়োজন মেটাতে সক্ষম।
কবিতা মূলত লোকশিক্ষা নয়, কিংবা তাকে রসসিক্ত করে পরিবেশন নয়, তাই যদি হতো তবে “সদ্ভাব শতক” শ্রেষ্ট কাব্যের মর্যাদা পেত, কিন্তু তা পায়নি।
স্লোগান কিংবা কোন বাণীও সেই অর্থে কবিতা নয়।
সামজিক পরিবর্তেন দায় কবির নিজের ঘাড়ে না নেওয়াই বাঞ্ছণীয়। তার জন্য সমাজপতিরা রয়েছেন। কবির কাজ সমাজপতিত্বের দায় কাঁধে তুলে নেওয়া নয়। অবশ্য তার মানে এই নয় যে তিনি সমাজের অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ কনবেন না। অবশ্যই করবেন, তা তার নিজস্ব ভাষার পরিমন্ডলের মধ্যে, তা কখনও, সমাজপতিদের মতো উচ্চকিত স্লোগান ধর্মী হবে না। কবি কখনই অসামজিক মানুষ নয়, ফলে তার কবিতায় সমাজের প্রতিচ্ছবি ফুঠতে বাধ্য, সৎ কবি কখনই সমাজ ত্যাগ করে গজদন্ত মিনারে বসে কবিতা লেখেন না আজকাল আর। তিনি আর পাঁচ জন মানুষের মতো এই সমাজেরই একজন অধিবাসী। ফলে সমাজের ভালমন্দের দায় তার উপরও বর্তায়। তিনি সমাজের সঙ্কটময় মুহূর্তে নীরব থাকতে পারেন না।
এই জন্যই বোধহয়, দার্শনিক এরিস্টটল ‘কবিকে সমাজের সদা জাগ্রত প্রহরী’ বলে
অভিহিত করেছেন।
অবশ্য তার গুরু সক্রেটিস ভাবতেন, সমাজে কবির কোন কাজ নেই, ফলে সমাজে তার কোন স্থান নেই। তাকে সমাজ থেকে তাড়ানো উচিৎ। কবি শঙ্খ ঘোষ যাকে শ্লেষ করে অনায়াসে বলেছেন, কবি “মূর্খ বড়,সামাজিক নয়”।
কবিতা পাঠ একটা একটা সতন্র রসাস্বাদনের ব্যাপার। সে স্বাদ গ্রহণের জন্য পাঠকেরও প্রয়োজন হয় মনে মনে প্রস্তুতি গ্রহণের, নতুবা তার কাছে, সে’রসের স্বাদ অধরাই থেকে যায় আজীবন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top