গন্ধর্ব নগরীর গল্প – সুব্রত সরকার

গল্প —   গন্ধর্ব নগরীর গল্প

                      সুব্রত সরকার

প্রাপ্য টাকা। তাও কত লড়াই- আন্দোলন, গেট মিটিং, ধর্মঘট করে মাইনে কাটিয়ে অবশেষে পাওয়া! মাইনে বাড়ল অনেকটা। সেই সঙ্গে দুধের সরের মত এল এরিয়ার। চার বছরের বকেয়া একসাথে পাওয়া হল- অনেকটা টাকা! তেত্রিশ বছরের চাকরি জীবনে অরূপরতনের এটাই সবচেয়ে বড় এরিয়ার পাওয়া।

কিন্ত কি আশ্চর্য! এমন এক দুঃসময়ে এতগুলো টাকা হাতে এল, মনে কোনও শান্তি নেই। চারপাশে অনিশ্চয়তা। ভোগ করা, আনন্দ করা, শপিং করা, বেড়াতে যাওয়ার সব দরজা-জানলাগুলো একটু একটু করে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। মানুষ তুমি ঘরবন্দী হও। একলা থাকো। আতঙ্কে থাকো। পট করে পটল তুললেও তুলতে পারো- এই ভেবে ভেবে ঘুম নষ্ট করো। কষ্ট পাও। এ কি দুর্দিন এল ভুবনে!…

গত বছরটা বিশে বিষ ছিল! এবছর ফের ফিরে এল দ্বিতীয় ঢেউ! আগে ঢেউ বললে, সমুদ্রের কথা মনে পড়ত। এখন ঢেউ মানে আতঙ্ক! শোনা যাচ্ছে তৃতীয় ঢেউও আসছে! টিকা নাও। নিলাম। তাও মনে শান্তি নেই। দুটো ডোজ ইনজেকশন নেওয়া অনলেরও কোভিড ধরা পড়ল গত পরশু!

সুজাতাকে স্বর্ণনিকেতনে নিয়ে যেতে চাইলেও সুজাতা নিজেই বলল, থাক এখন আর সখের গয়না-টয়নার দরকার নেই। তুমি বলেছো, আমি খুশি হয়েছি। টাকাগুলো সাবধানে রাখো। মেয়ের বায়না ছিল একটা আইফোন। সেটাও কিনতে যাওয়া হচ্ছে না। লকডাউন গ্রাস করেছে বাজারকে। ছেলের বাইকের বায়নাকে একদমই প্রশ্রয় না দিতে বলল সুজাতা।

অরূপরতনের নিজের খুব ইচ্ছে ছিল, একটা দারুণ ফ্যামিলি ট্যুর। বেশ ল্যাভিশলি এই ট্যুরটা করবে। লাক্ষাদ্বীপ যাওয়ার একটা গোপন বাসনা ছিল। কিন্তু এখন লক্ষ্মীকান্তপুরে যাওয়াও বারণ! লকডাউন বেড়ি পরিয়ে দিয়েছে সব গোপন ইচ্ছের স্বপ্নগুলোকে।

এতগুলো টাকা ব্যাঙ্কের সেভিংস এ্যাকাউন্টে রেখে কি লাভ! ভালো কোথাও একটা ইনভেস্ট করেই নয় রাখবে। অফিসের সুপ্রতিম বলছিল, গন্ধর্ব নগরের কাছে জমি কেনার কথা। অরূপরতনের ওসব জমি টাকা, টাকা জমিতে একদমই মন নেই।

অবশেষে চন্দন দাশের কথাই মনে এল। অরূপরতনের যাবতীয়  সঞ্চয়ের উপদেষ্টা চন্দন।  ও ভালো ফিনানশিয়াল অ্যাডভাইজার। ওকেই ফোন করে বলবে, টাকাগুলো কোথায় রাখলে ভালো হয় বলো। এবং তার ব্যবস্থা করো।

সুজাতাও তাই বলল,”এখন টাকাগুলো গুছিয়েই রাখো।  বাজে খরচের দরকার নেই।”

চন্দন দাশের ফোন বেজে গেল। অরূপরতন একটু অপেক্ষা করার পর আবার করল। এবারও ফোন বাজছে। প্রায় শেষ মুহূর্তে কলটা ধরে যে কথা বলল, সে চন্দন নয়। মহিলা কন্ঠে ভেসে এল, “হ্যালো, কে বলছেন?”

” চন্দনের সাথে একটু কথা বলতে চাই।”
“ও! কিন্তু বাবা তো হসপিটালে ভর্তি।”
” তাই! কেন? কি হয়েছে?”
” বাবা এখন আই সি ইউ তে আছে। অক্সিজেন লেভেল ভালো নয়। কো মর্বিডিটির কারণে বাবা ভালো নেই আঙ্কেল!…”

অরূপরতন বারান্দার অন্ধকারে একা বসে।
পথ- ঘাট শুনশান। চারপাশ কেমন নির্জন। নিশ্চুপ। এভাবে চুপচাপ বসে থাকতে থাকতে ওর মাথার ভেতর অনেক ভাবনা খেলা করে। অরূপরতন ভাবছে। ভাবতে ভাবতে হঠাৎ মোবাইলটা হাতে তুলে নিয়ে ফোন করল সুপ্রতীমকে। অফিসের কাছের বন্ধু সুপ্রতীম ফোন ধরে বলল,” হ্যাঁ, বল রে…”
” বলছি তুই গন্ধর্ব নগরে জমি কেনার কথা কেন ভাবছিস?”
“এমনিই কিনে রাখতাম। বুড়ো বয়সে যদি ইচ্ছে হোত তো ওখানকার সুন্দর গ্রামীণ পরিবেশে একটা ছোট্ট বাড়ি করে থাকতাম।”
“তাই!”
“কেন? তুই কি ভাবছিস?”
“ভাবছি…”
” কি ভাবছিস বল…”
” যদি আমরা একসাথে অনেকটা জায়গা কিনতে পারি কেমন হয়?”
“একসাথে? অনেকটা! কেন?”
“বুড়ো বয়সে  যদি কিছু একটা নিয়ে মেতে থাকতে  পারি তো…”
“মানে!”
“ধর আমরা যদি ওখানে একটা পাঠশালা করি। গ্রামের বাচ্চাগুলো পড়বে। ওদের একটু তো উপকার হবে। আর আমরাও পড়াতে পারি। সময়টা কি ভালো কাটবে বল…”
” ওরে বাবা,তুই তো জব্বর স্বপ্ন দেখেছিস…”
” ধর ওখানে একটা দাতব্য চিকিৎসালয়ও করতে পারি। গ্রামের অভাবী লোকগুলোর একটু তো উপকার হবে। তোর মেয়েই তো সামনের বছর ডাক্তার হয়ে বেরবে। ওকেও পাব এই কাজে।”
” তুই হঠাৎ এসব কেন ভাবছিস?”
“হঠাৎই এলরে ভাবনাটা। টাকা পয়সা তো অনেক রোজগার করলাম বল। সঞ্চয়ও কিছু করেছি। এবার একটু এসব কাজ আমরা তো করতেই পারি।”
” তা পারি। কিন্তু আমরা দু’জন শুধু পারব?…
“অফিসের  দু’একজনকেও বলে দেখতে পারি…”
” অনেক দায়িত্ব, ঝামেলা কিন্তু আছে…”
” তুই যে সংসারটা করছিস, তারও তো কত দায়িত্ব, কিন্তু পালন তো করছিস। ঝামেলাগুলোও সামলাচ্ছিস। এটাও পারবি।”
” ঠিক আছে। আরেকটু ভাব। আমি আছি।”

অরূপরতন বারান্দার অন্ধকারে আলোর ঝলসানি যেন দেখতে পেল। স্বপ্ন ছুঁয়ে দেখার আনন্দ টের পায় নিজের ভেতরে। এবার সুজাতাকে বলতে হবে। নিশ্চয়ই ও ও বলবে,” এগিয়ে যাও। পাশে আছি।”…

।। সমাপ্ত।।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top