চক্ষুধারী

.
@@ চক্ষুধারী ( গল্প) @@
.
** প্রকাশ চন্দ্র রায় **
.
বাঁশঝাড়ের কাছে এসে থমকে দাঁড়ালো শিমুল। ঘুটঘুটে অন্ধকারে সামান্য কিছু জোনাকী জ্বলছে মাত্র আর ঝিঁ ঝিঁ ডাকছে একটানাভাবে। তার মাঝে চকচকে হলদে আভাযুক্ত বড় বড় ভয়ঙ্কর দুটি চোখ সরাসরি তাকিয়ে আছে তার দিকে। ঘড়ঘড় আওয়াজ হচ্ছে চক্ষুধারী’র নাক নাকি গলা থেকে সঠিক বোঝা যাচ্ছে না।
সারাশরীর শিউরে শিউরে উঠতে লাগল তার। আতঙ্কে থর থর করে কাঁপতে লাগল শিমুল। সামনে এগুবে নাকি পিছনে ফিরবে কোনটাই স্থির করতে পারছে না সে। খুব জোরে চিৎকার করে কাউকে যে ডাকবে এমন সাহসও হচ্ছে না তার, কন্ঠ থেকে কোন স্বর ফুটছে না ভয়ে। হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাঁপতেই থাকল শুধু।
বাঁশঝাড়ের ছোট ছোট ঝোপঝাড় মারিয়ে তার দিকেই এগিয়ে আসছে ভয়ঙ্কর উজ্জ্বল চক্ষুধারী। হঠাৎ করে মনে পড়লো তার, আজ মঙ্গলবার, তার উপড় অমাবস্যার রাত। শুনেছে সে বছর কয়েক আগে এই বাঁশঝাড়ে মঙ্গলী নামে এক মেয়ে প্রেমে ব্যর্থ হয়ে বাঁশঝাড়ে অবস্থিত ছাতিম গাছের ডালে ফাঁস লটকে আত্মহত্য করেছিল। বাঁশঝাড়ের পিছনের শ্বশ্মানে দাহ করা হয়েছিল তাকে কিন্ত তার আত্মা শ্বশ্মান ছেড়ে এই বাঁশঝাড়েই আশ্রয় নিয়েছে । মাঝে মাঝে কোন কোন অমাবস্যায় কিংবা শনি, মঙ্গলবারে গভীররাতে কোন যুবকের দেখা পেলে প্রেম নিবেদন করে সে। কেঁদে কেঁদে বলে “আমি তোমাকে ভালবাসি বন্ধু, আমাকে এখান থেকে উদ্ধার করে নিয়ে যাও”।
শিমুলের অবশ্য সে ভয় নেই কারন তারমতো ছোট্ট ছেলেকে প্রেম নিবেদন করবে না মঙ্গলী। সে তো কেবর ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ে। তার বাড়ী অনেক দূরের গ্রামে বিধায় সে থানা শহরের পাশেই মামার বাড়ীতে থেকে বড়মামা’র মেয়ে চন্দনা এবং ছোট মামা’র ছেলে জয়রাম সহ একই স্কুলে একই শ্রেণীতে পড়ে। বড় মামী ঐ স্কুলেরই শিক্ষিকা। মামাতো বোন চন্দনা অবশ্য তার থেকে বেশী সাহসী এবং বুদ্ধিমতি।
আজ বিকেলে- চন্দনা, জয়রাম, সুমন, শিমুল, মিনা, রীতা এরা সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, মামাদের বাগানে রাতে বনভোজন করা হবে। তার কিছু বাজার সওদা আনতে ভুলে যাওয়ায় আবারো শিমুলকে বাজারে পাঠানো হয়েছিল। বাজার সওদা নিয়ে ফিরতে সন্ধ্যা পেরিয়ে যাওয়ায় এই বিপদের সম্মুখীন হয়েছে শিমুল। বাঁশঝাড় পেরিয়ে বিশ ত্রিশ গজ এগুলেই পাড়ার গোড়ায় পৌঁছানো যায়।
ভাগ্য খারাপ তাই আজ সন্ধ্যা থেকে বিদ্যুৎ নেই। তা না হলে এখান থেকেও পাড়ার বিদ্যুতের আলো চোখে পড়তো। সে, যে রাস্তায় এসেছে সেটা একটা পায়ে চলা চোরাপথ বিধায় ঐ পাড়ার লোকজন ছাড়া অন্য কেউ’ই যাতায়াত করে না এ পথে এবং রাস্তাটি চিকন হওয়ায় রিক্সা, ভ্যান বা অন্য কোন যানবাহনও চলাচল করতে পারে না। শ্রাবণ রাতের মেঘলা আকাশ থেকে এখন আবার টুপটাপ বৃষ্টি ঝরা শুরু হল। ভয়ে ভয়ে আবার চোখ তুলে বাঁশঝাড়ের দিকে তাকালো শিমুল। ভয়ঙ্কর চোখদুটো বেশীদূর এগিয়ে আসে নি বরঞ্চ একটা ঝোপের আড়াল হয়েছে, তবুও তো চোখদুটো’র উজ্জ্বলতা কমে নি মোটেও।
কিংকর্তব্যবিমূঢ় শিমুল ভাবলো, সে খুব জোড়ে একটা দৌড় দিবে। ঐ মুহূর্তে শোনা গেল চন্দনা’র ডাক-
:-শিমুল, এ্যাই শিমুল,তুই কত দূরে রে?
চন্দনার ডাক শোনা মাত্রই হৃত সাহস ফিরে পেল সে। ক্ষীনকন্ঠে উত্তর দিল,
:-এই যে চন্দনা,আমি এখানে।
মুহুর্তখানেকের মধ্যেই টর্চ হাতে চন্দনা ও জয়রাম এসে উপস্থিত হলো। এতক্ষণে শিমুলের মনে পড়ল যে,”ভয় পেলে নিজের বুকে থু-থু ছিটাতে হয় “। তৎক্ষণাত তাই করল সে,আর কী আশ্চর্য কান্ড! পুরোদমে সাহসী হয়ে উঠল শিমুল। চন্দনাকে বলল,
:-দে তো দেখি টর্চটা।
টর্চ নিয়ে ফোকাস করল চক্ষুধারীর দিকে,দেখল-চক্ষুধারী আর কেউ নয়! একটা বনবিড়াল,মরা একটা হাঁস কামড়ে ধরে ইতস্ততঃ ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে। চন্দনা,জয়রাম আর শিমুল খুব জোরে একটা ধমক দিতেই-এক-দুই-তিন লাফে পালিয়ে গেল বেটা বনবিড়াল। (সমাপ্ত)।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top