চলো ছাদে যাই – সুব্রত সরকার

সকালের ঠিক এই সময়টায় খবরের কাগজটা উড়ে এসে বারান্দায় পড়ে। একটা ছোট্ট আওয়াজ হয়। সুখময় প্রায় ছুটে বারান্দায় গিয়ে কাগজটা নিয়ে আসেন।

আজও চায়ের কাপটা রেখে ছুটে যাচ্ছিলেন সুখময়, শুভশ্রী বাধা দিয়ে বললেন,” থাক্ এখনই যেও না। কাগজ পড়াটা এবার কিছুদিন বন্ধ করো।”
সুখময় অবাক চোখে চেয়ে বললেন,” মানে! কাগজ পড়ব না?”
” এখন কিছুদিন না পড়লেই ভালো।” শুভশ্রী ছানার বাটিতে গরম দুধ ঢালতে ঢালতে বললেন,” কাগজের খবরগুলো আর পড়তে ইচ্ছে করে না। এগুলো পড়লে আরও দুঃশ্চিন্তা বাড়ে। অজানা ভয় গ্রাস করে নেয় সব কিছুকে।”
সুখময় থমকে গেলেন। কাগজটা কুড়িয়ে আর আনলেন না। শুভশ্রীর সাথে কথা জুড়ে দিয়ে বললেন,” খানিকটা ঠিকই বলেছো, এখন খবরের কাগজ আর টিভি দুটোর থেকেই কিছুদিন দূরে থাকা ভালো। এরা মানুষকে আরও আতঙ্কগ্রস্ত করে তুলছে। ”

” চলো ছাদে যাই। একটু হেঁটে আসি।” শুভশ্রীর আহ্বানে দুজনে ছাদে উঠে এসে দাঁড়ালেন। হাঁটুতে ব্যথা। সুখময় ধীরে ধীরে সিঁড়ি ভেঙ্গে উঠলেন ছাদে আজ অনেকদিন পর। শুভশ্রী টবগুলোর কাছে সুখময়কে নিয়ে গিয়ে আলতো হেসে বললেন,” আজ থেকে তুমি সব টবে জল দেবে। গাছেদের যত্ন করবে।”
” তাই!” সুখময় অবাক হেসে বললেন,” তুমি আর জল দেবে না কেন? গাছগুলো তো তোমার!”
শুভশ্রী ঠোঁট চেপে হেসে বললেন,” আজ থেকে আমার সব গাছ তোমাকে দিয়ে দিলাম!”
সুখময় শান্ত ভাবে হাসলেন। শুভশ্রী হাতছোঁয়া দূরত্বে দাঁড়িয়ে। সকালের নরম সুবাতাস ছাদে ছড়িয়ে আছে। বড় মনোরম লাগছে। ছাদে এসে কথা বলে, গল্প করে দুজনেরই মন বড় হাল্কা হয়ে গেছে। মনেই পড়ছে না, পৃথিবীতে এখন এক গভীর অসুখ। প্রতি মিনিটে মানুষ মরছে একটা করে!

গতকাল রাতেই খবর পেয়েছেন প্রতিবেশী স্বপনবাবু ও তাঁর স্ত্রী দুজনেই কোভিডে আক্রান্ত। সুখময়ের চেয়ে সামান্য বড়। বাড়িতে দুই বুড়োবুড়ি একলা থাকেন। সুখময়-শুভশ্রীও একলা থাকেন। এই মহামারীর দুর্দিনে সব সময় মন ভারাক্রান্ত আর অজানা আশঙ্কায় কেমন গুটিয়ে গেছে সবকিছু।
হঠাৎ একটা পাখি শিস দিতে দিতে দূরে উড়ে চলে গেল!

সুখময় পাখিটাকে চেনার চেষ্টা করলেন। চিনতে না পেরে শুভশ্রীর দিকে চেয়ে কিছু বলতে যাবেন, তখন শুনতে পেলেন,” কিছুই কোথাও যদি নেই / তবু তো ক’জন আছি বাকি/ আয় আরো হাতে হাত রেখে / আয় আরো বেঁধে বেঁধে থাকি”?
কতদিন পর যেন সুখময় শুনলেন তাঁর প্রিয় কবির এই অসাধারণ পংক্তি কটা। শুভশ্রী আজও কি সুন্দর স্মৃতির অতল থেকে বলতে পারে! সুখময় ভীষণ আবেগতাড়িত হয়ে বললেন,” তোমার মনে আছে শঙ্খবাবুর সেই কবিতাটা, আমি তোমায় খুব মজা করে খালি বলতাম, খুব বুড়োবুড়ি হয়ে গেলে, কালা হয়ে গেলে,আমরা একে অন্যকে শোনাব। মনে আছে তোমার”?
শুভশ্রী হাসলেন। নীরব সম্মতিতে মাথা নাড়লেন। অর্থাৎ মনে আছে। তারপর একটু ভেবে দু-চোখ বন্ধ করে বলতে শুরু করলেন,” কে বলে আমার স্বরে সংযোগ নেই?/ কে বলেছে তুমি শুনতে পাও না ভালো?/ এখনও হঠাৎ হাতে হাত রাখলেই / মনে হয় বুঝি বিদ্যুৎ ঝলকালো।”

সুখময় হঠাৎই হাতদুটো বাড়িয়ে দিলেন। শুভশ্রীও সেই স্পর্শসুখের আনন্দে হেসে কাছে চলে এলেন।

ছাদে এখন রোদ আর তত নরম নেই। তবু যেন কোনও কষ্ট হচ্ছে না। সেই পাখিটা হঠাৎ শিস দিতে দিতে উড়ে আসছে ওঁদের দিকে। সুখময় এবার চিনে নেবেনই পাখিটাকে!…

।। সমাপ্ত।।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top