চিঠি

#চিঠি

লিপি,
শুরুতে পুষ্পশোভিত শুভেচ্ছা কুড়িয়ে নিও দখিনের জানালার পাশে প্রস্ফুটিত রজনীগন্ধা থেকে, আমি বাতাসের হাতে রজনীগন্ধার সুবাস তুলে দিয়েছি।

আমাকে নিয়ে খুব বেশি অন্তর জ্বালায় ভুগতে যেও না। কেননা অামি হৃদয় তন্দ্রীর বীণায় দুঃখের লৌহ চূর্ণ বসতে দিই না। কেন জানো? তাতে সুখের তারগুলোতে জং ধরে বেদনার জংশন গেড়ে বসতে পারে। হৃদ মাঝারে তৃপ্ত সুরের মূর্ছনা তুলে যে অনুভূতি,তাকে রুষিত করে কি সুখ সঙ্গীতের তৃষ্ণা মেটানো সম্ভব? নিশ্চয় না। তুমি যে অনুভবের সুর তরঙ্গ। সুতরাং দোদুল্যমান হতাশাকে ভাসিয়ে দাও প্রণয় শক্তির আত্মবিশ্বাসের বন্যায়।

লিপি,
আমার অনুপস্থিতি অনুভব করে অশান্ত প্রাণে যদি কখনো কষ্টের মেঘ মনের আকাশে দুর্যোগের ঘনঘটা সৃষ্টি করতে উদ্যত হয়,তখন মন মাঝারে রংধনুর ছোঁয়া এঁকে সাগর পাঁজরে প্রক্ষেপন করে দিও। সাগর গাত্রে ভর করে মনোদৃষ্টিতে অামি হিরক জ্যোতির বিচ্ছুরণ ঘটাবো। দেখবে প্রফুল্ল চিত্ত উদ্বেলিত হয়ে সাগরের গভীর অনুরণনের প্রতিধ্বনি তোমাকে আত্মবিশ্বাসের যোগান দেবে, কষ্টচূর্ণ মূহুর্তের মধ্যে নিরুদ্দেশ পথে যাত্রা করতে বাধ্য হবে। ধ্যানমগ্ন যোগির ন্যায় কোন কষ্টকেই জগদ্দল পাথরের মত বসার সুযোগ দিতে নেই। মনে রেখো, কষ্টকে হাতছানি দিয়ে পায়চারি করতে থাকে কষ্টেরই পরম বন্ধু ধৈর্য। আত্মাশুদ্ধির বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেহ সৌষ্ঠব পরিচর্যায় নিমগ্ন হলে মনোরাজ্যে আগাছা গজাবেই। আর তাই মন কে শিকলাবদ্ধ করতে হবে ধৈর্যের বাঁধনে। কষ্টের মসৃণ প্রলেপে হিয়ারাজ্যের ভিত্তি গড়ে তুলতে পারলে আত্মত্যাগে মানব ধর্ম সাধন হয়।

লিপি,
তোমার পড়ার টেবিলের উত্তরের জানালা ঘেঁষে লিচু বাগানে ঝুলতে থাকা দোলনায় বসে থাকি কেন জানো? সেখানে বসে দোল খেয়ে ম্রিয়মান মানসকে উৎফুল্ল করি তোমার অস্তিত্বকে ধারণ করে। পড়ার সময় তোমার ঠোঁটজোড়ার সন্ধি স্পন্দনের ঘন্টা ধ্বনির তৃপ্তকর সুরেলা অনুরণন, অন্তভূমির তপ্ত বালুকারাশি শীতল করে তুলে। এই অনুভূতিটাই হল অস্পর্শ ভালোবাসার পবিত্র ভিত্তি। ভালোবাসার আসলে নিজস্ব কোন বৈশিষ্ট্য নেই। সততা অার বিশ্বাসের উপর একাগ্র চিত্ত হয়ে ভালোবাসার বৈশিষ্ট্যের শাখা-প্রশাখাগুলো বপন করতে হয়। অার সেজন্য ভালোবাসাকে ভালো রাখতে হলে ভালোবাসতে হবে ভালোবাসাকেই। ভালোবাসাকে ভালো রাখতে হলে কখনো হয়তোবা নিজে ভালো থাকা যায় না, কখনো বা ভালোবাসাকে ভালো রাখা যায় না। তাই বলে কি অস্থিরতায় স্থির থাকতে হবে? নাকি স্থির থাকাটা ভালোবাসার দৃষ্টিতে বুদ্ধিমত্তার পরিচায়ক বলে বিবেচিত হবে? কখনোই না। হেমন্তের কাঁধে ভর করে চুপটি করে শীতের যেমন আগমন ঘটে,এসেই প্রভাতে কুয়াশার চাদরে ঢাকতে শুরু করে প্রকৃতি। আবার শীতের বৈরাগ্যের ধ্যান ভেঙ্গে কুয়াশার কুণ্ডলী ভেদ করে বাসন্তী সাজে পদার্পণ করে প্রকৃতিকে রূপে-রঙে রসে ঝলমল করে সাজিয়ে তুলে বসন্ত। রাতের অাঁধার যেমন ভয়ের অাতংক সৃষ্টি করে,ভোরের সূর্যালোকও উদ্দীপনামূলক প্রেরণার খোরাক যোগায়। শংকা,সংশয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে, আশার সঞ্চার করেই মনের একান্ত অনুভব শক্তিমত্তায় ভালোবাসাকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। আর সে জন্য মনকে গড়ে তুলতে হবে সাগরের মত গভীর এবং অাকাশের মত বিশাল করে। বিশাল মন অার সুবিন্যস্ত প্রেমানুভূতিকে সুদৃঢ় প্রত্যয়ে স্থাপিত করতে হবে অন্তদৃষ্টির নেত্রগহ্বরে। তবেই চিরকার বেঁচে থাকবে ভালোবাসা, অমর হবে অামাদের প্রেম।

শেষান্তে বলিঃ
নীল শাড়ীতে তোমার দুর্বলতা। তাই আকাশপানে অপলক হয়ে দৃষ্টির ক্ষুধা নিবারণ করি। দিনের ক্লান্তিশেষে বৈকালিক বিষণ্নতা দূরীভূত করতে রঙিন অালোক রশ্মি ছড়িয়ে থাকে গোধূলী লগ্ন। সোনালী রোদ্দুর জানান দেয়,জীবন সায়াহ্নে তৃপ্তকর সৌন্দর্যও পথ চলার প্রেরণা দিতে সক্ষম। নীল শাড়ীতে তুমি বসে থাকো চোখ অম্বরে। সূর্যাস্তের রক্তিমা তুলে লাল টিপে লেপ্টে দেবো তব কপোল। যামিনী পাতে আয়েশ করবো মধুর গল্পে।

ইতিঃ
তোমার প্রাণের বীণা লিপন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top