ছ’টা চল্লিশের শান্তিপুর লোকাল

ছ’টা চল্লিশের শান্তিপুর লোকাল
অসীম কুমার চট্টোপাধ্যায়

আমি তখন দক্ষিণ কলকাতার একটি নামি কবিরাজি ওষুধের কোম্পানির সেলস এক্সজিকিউটিভ । ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে চাকরির সুবাদে আমার যাতায়াত । কিছুদিনের জন্য কলকাতা অফিসে বদলি হয়ে এসেছি । মফস্বল শহরে থাকি । লোকাল ট্রেনেই যাতায়াত । সকাল ছ’টা চল্লিশের শান্তিপুর লোকালের রোজকার যাত্রী । আমার সাথে থাকতো আমার এক সহকর্মী । দুজনে সাইকেল করে যেতাম স্টেশনে । তারপর ট্রেনে । আমার সহকর্মীর নাম দুলাল । দুলাল প্রতিদিনই আমাকে একটা নির্দিষ্ট কম্পার্টমেন্টে ওঠাতো । ওই কম্পার্টমেন্টে শান্তিপুর থেকে একদল অফিসযাত্রী আসতেন খঞ্জনি বাজিয়ে কীর্তন করতে করতে । দুলাল বৈষ্ণব পরিবারের ছেলে । ওর ভালো লাগতো কীর্তন শুনতে । শুধু শোনা নয় , রীতিমত দলে ভিড়ে গান গাইতো । তবে হ্যাঁ , দুলালের গলাটা খাসা । দুলাল ওই দলের মধ্যমনি । ঠিক আছে , যার যা ভালো লাগে সে তা করুক । শুধু এইটুকু লক্ষ রাখলেই হবে যাতে অন্যের অসুবিধা না হয় । আমার কান ঝালাপালা করত । মনে হত নেমে যাই । পারতাম না । দুলাল নজর রাখতো । খুব কষ্ট করে এতটা পথ আমাকে যেতে হত । অনেকবার বলেছি আমাকে ছেড়ে দে । তোর ভালো লাগে তুই ওদের সাথে গান কর । আমি তো কোনো আপত্তি করছি না । আমি অন্য কম্পার্টমেন্টে উঠবো । দুলাল তখন আবেগ তাড়িত হয়ে এমন সব কথা বলা শুরু করতো যে আমাকে নিরুপায় হয়ে ওর সাথে ওই কম্পার্টমেন্টেই উঠতে হত ।
বিধান নগর স্টেশন ছাড়বার পরেই গান বন্ধ হবে । গোছ গাছের পালা আরাম্ভ । দুজন ভদ্রলোক দু পাশের যাত্রীদের বাতাসা বিতরণ শুরু করেন । যারা এতক্ষন বিরক্তিকর মুখ নিয়ে বসে ছিলেন তারা সবাই হাত বাড়িয়ে বাতাস নিতেন এবং খেতেন । রাস্তা ঘাটে দুমদাম কিছু খাওয়া আমার ধাতে সয় না । ভালো করে হাত ধুয়ে খাওয়া আমার ছোট বেলার অভ্যাস । দুলাল মহানন্দে দুহাতে দুটো বাতাসা নিয়ে চাটতে চাটতে চলে আসতো আমার কাছে । ওর বাতাসা খাবার ধরন দেখে আমার গা ঘিনঘিন করতো ।
একদিন অবাক কান্ড ! ওই ট্রেন , ওই কম্পার্টমেন্ট কিন্ত কীর্তন পার্টি নেই । দুলালের মন খারাপ হয়ে গেল । আমি অবশ্য স্বস্তি পেলাম এই ভেবে যে কান দুটো একটু বিশ্রাম পাবে । গল্প করতে করতে পুরোটা পথ যাওয়া যাবে । একেই বলে বিধি বাম । ঠিক পরের স্টেশন থেকে উঠলো একজন হকার । হাতের ব্যাগটাকে এক পাশে সরিয়ে রেখে ইংরেজিতে কিছুক্ষন ভাষণ দিলেন । তারপর বলা শুরু করলেন । বলার ধরন অনেকটা এরকম ,
” মার্জনা করবেন , আমি একজন ডাক্তার । ডাক্তার মানে ফাইনাল ইয়ারের পরীক্ষাটা দেওয়া হয় নি । না দেবার কারন আমার বাবার মৃত্যু । মা এবং ছোট ছোট ভাইবোনদের বাঁচাতে চাকরির সন্ধানে ঘুরতে শুরু করলাম । কে দেবে চাকরি ? অবশেষে একটা ওষুধ কোম্পানির সেলসের কাজ পেলাম । কিন্তু মাস কয়েক যেতে না যেতেই জানতে পারলাম আমি যে ওষুধ বিক্রি করি সেগুলো সব জাল ওষুধ । মনটা বিষিয়ে গেল । মানুষের জীবন নিয়ে এইভাবে ছেলেখেলা । ছেড়ে দিলাম চাকরি । তখনি মাথায় এসেছিল সেলসের কাজই করবো তবে এমন জিনিস বিক্রি করবো যা মানুষের উপকারে লাগে । গরিব মানুষকে হাসপাতালে যাওয়ার হাত থেকে বাঁচাবে । প্রায় মাস দুয়েক কাজকর্ম ছেড়ে বইপত্র নিয়ে বসলাম । মা লোকের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করা শুরু করলো । শেষ পর্যন্ত আমি সফল । এমন এক কবিরাজি ওষুধ আবিষ্কার করলাম যা খেলে শরীরে কোনো রকম অসুখ বাসা বাঁধতে পারবে না । বিশেষ করে যারা পেটের অসুখে ভোগেন তাদের জন্য এই ওষুধ অবর্থ কাজ করবে । এই ওষুধ বাইরে কোনো দোকানে বা অন্য কোনো হকারের কাছে পাবেন না । এর পেটেন্ট আমার নেওয়া আছে । আমার কাছে আছে অল্প কিছু প্যাকেট । এখানে যারা গরিব শুধুমাত্র তারা আজকে নিন । সাত দিন পরে আমাকে জানাবেন । উপকার যদি না পান , সামনের সোমবার এই কম্পার্টমেন্টে এসে আমি সবার টাকা ফেরৎ দিয়ে যাবো ।
এরপর হকার ছেলেটি ব্যাগের ভেতর থেকে কতকগুলো প্যাকেট বের করে আবার বলা শুরু করলো , এই দেখুন দুটো প্যাকেট । ভেতরে কালো কালো বড়ি । একদম একরকম দেখতে । যারা চেনেন না তারা নকলকে আসল ভেবে নিয়ে যান । আপনাদের মধ্যে কেউ যদি বলতে পারেন কোন প্যাকেটের বড়ি আসল কালমেঘ পাতা থেকে তৈরী , তাকে আমি পাঁচশো টাকা এখুনি দেব । আসুন , কে বলবেন ?
পাঁচশো টাকার লোভে কিংবা নিজের পান্ডিত্য ফলাতে অনেকেই হাতে নিয়ে দেখলেন কিন্তু কেউই সঠিক বলতে পারলেন না ।
ছেলেটি বলল , এই দুটো প্যাকেট দেখাবার উদ্দেশ্য আপনারা যাতে নকল কিনে না ঠকেন ।
একজন বলল , আমাকে একটা প্যাকেট দিন ।
হকার ছেলেটি রসিকতা করে বলল , আসল না নকল ?
না না , নকল দেবেন কেন ? আসলটাই দেবেন ।
এইভাবে চিনে নিন আসল আর নকলের ফারাক । দেখিয়ে দিল ছেলেটি । দেখতে দেখতে কম্পার্টমেনন্টের প্রায় সকলেই একটা করে প্যাকেট কিনে নিল ।
শিয়ালদা স্টেশন এসে গেছে । সবাই নামতে ব্যস্ত । হকার ছেলেটিও নামল । আমি ঠিক ছেলেটির পেছনে । স্টেশনে ভিড় পাতলা হয়ে গেলে একটা চায়ের স্টলের সামনে দাঁড়িয়ে ছেলেটি এক কাপ চায়ের অর্ডার দিল ।
আমি ছেলেটির সামনে দাঁড়িয়ে বললাম , ভাই একটা কথা আছে । সত্যি বলো । আমি কথা দিচ্ছি আমার দ্বারা তোমার কোনো ক্ষতি হবে না । কেউ জানবে না ।
ওই দুটো প্যাকেট কি আলাদা ? আমার মতে দুটোই এক এবং দুটোই নকল ।
ছেলেটি অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে । উত্তর খুঁজে পাচ্ছে না ।
আমি পকেট থেকে একই রকম দেখতে একটা প্যাকেট বের করে বললাম , ভালো করে দেখ । এই হচ্ছে আসল কালমেঘ পাতার বড়ি । দক্ষিণ কলকাতায় আমাদের নামি কোম্পানির তৈরী ।
ছেলেটি চলে যাবার আগে বলে গেল , আমার প্যাকেট গুলো সব ওই কোম্পানির । আমি ওই ওষুধের দোকানের সেলসম্যান । সবই নকল ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top