পহেলা (অণুগল্প)

# অণুগল্প — পহেলা
# গল্পকার — অভিষেক সাহা

হঠাৎ জোরে কড়া নাড়ার শব্দে ঘুম ভেঙে গেল সুনন্দর। ঘুম জড়ানো চোখে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল সাড়ে তিনটে বাজে। ” এখন আবার কে এলো?” মনে মনে প্রশ্ন করল বছর সত্তরের সুনন্দ। বিকেল পাঁচটার সময় সাবিত্রী আসবে। চা করে ডাকবে। কিন্তু সাবিত্রী তো কড়া নাড়বে না, ওর কড়া নাড়ার দরকার নেই। ওর কাছে ডুপ্লিকেট চাবি আছে। তারপর তো রাতের রান্নার প্রশ্ন!
এখন আর সুনন্দর কাছে কেউ আসে না, আত্মীয়, স্বজন বা বন্ধু , কেউ না। একটা সময় ছিল যখন এই বাড়িটা লোকে গমগম করত। প্রথমে সুনন্দর স্ত্রী মারা গেল তারপর একমাত্র ছেলে লন্ডন চলে গেল। এখন বউ বাচ্চা নিয়ে সেখানেই থিতু হয়েছে। বছর চল্লিশের সাবিত্রীই এখন সুনন্দর একমাত্র ভরসা। রান্না থেকে শুরু করে সব কাজ ওই করে। তবে এখন কে এলো! ভাবনার মাঝেই কড়াটা আবার জোরে বেজে উঠল।
এবার ঘুম সরিয়ে দরজার কাছে গেল সুনন্দ। দরজা খুলল না, লুকিং গ্লাস দিয়ে দেখল। সেই বিচ্ছু ছেলেটা। বছর দশ বয়েস হবে , সামনের কলোনীতে থাকে। অনেকবার সুনন্দর বাড়ির বাগান থেকে কখনো ফল কখনও ফুল চুরি করে নিয়ে গেছে। ওর বাড়ির লোককে নালিশ করে কোনো কাজ হয়নি । কিন্তু ও এখন কেন? মনের মাঝে আশঙ্কার মেঘ জমতে শুরু করল।
” কী হয়েছে কী চাই! যা এখন পরে আসবি।” দরজা না খুলেই গলা চড়িয়ে বলল সুনন্দ।
” একটু খোল না দাদু, তোমার জন্য একটা জিনিস এনেছি। দুষ্টু করব না ।” বাচ্চা ছেলেটাও দরজার ওপার থেকে অনুরোধ করল।
সুনন্দ কিছুতেই খুলবে না, বাচ্চাটাও ছাড়বে না। শেষ পর্যন্ত মধ্যপন্থা অবলম্বন করল সুনন্দ।
দরজাটা একটু ফাঁক করে মাথাটা বের করে সুনন্দ বলল ” বল কী বলবি !”
সুনন্দর এই কান্ড দেখে বাচ্চাটাতো হেসেই অস্থির। কোনও মতে হাসি থামিয়ে, ওর হাফপ্যান্টের পকেট থেকে দু’টো লাল গোলাপ বের করে সুনন্দর হাতে দিয়ে, ওর পায়ে প্রণাম করে বলল ” এই দু’টো তোমার জন্য। আমাদের বাড়ির গাছের। আজ তো পহেলা বৈশাখ , তাই তোমাকে শুভ নববর্ষ। ”
লন্ডনে বোধহয় তখনো পয়লা বৈশাখের সূর্য ওঠেনি!

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top