বাবা (ছোট গল্প)

# বাবা # (ছোট গল্প)
“””””””””””””””””””
—— হোসেইন আহমদ চৌধুরী।

লেখাপড়ার পাট চুকিয়ে কর্মজীবন শুরু করতে যাচ্ছি। কর্মস্থল শ্রীমঙ্গলের একটি চাবাগান। আজ সন্ধ্যায় কর্মস্থলের উদ্দেশ্যে যাত্রা করবো। আগামীকাল কাজে যোগদান করতে হবে।
সকাল থেকে মায়ের তোড়জোড় আর বাবার হমকিধমকিতে বিরক্ত হয়ে বন্ধুদের কাছ থেকে বিদায় নিতে গেলাম। ঘন্টাখানেকের মধ্যে তিনবার বাবার ফোন- এই অসময়ে বাইরে কি করছিস? এখনই বাড়ি আয়। বিরক্ত হয়ে বাড়ি ফিরে আসতে হলো।
কাপড়চোপড়ের ব্যাগ নিজেই গুছিয়ে নিয়েছি। এরপরও বাবার রাগারাগি চেঁচামেচি মায়ের সাথে। আমার ব্যাগ গোছানো হয়েছে কি না, সবকিছু ব্যাগে ঢুকানো হয়েছে কি না?
সন্ধ্যায় বেরুতে যাবো। অগ্রহায়ণের মাঝামাঝি সময়, শীতের নামগন্ধও নেই। বাবা একের পর এক নির্দেশ দিয়েই চলেছেন- জ্যাকেট গায়ে চড়িয়ে নে, মাফলারটা গলায় জড়িয়ে নে। বিরক্তির চরম সীমায় পৌঁছে নির্দেশগুলো পালন করতে হলো। বেরুনোর মিনিট পাঁচেক আগে বাবা নিরব হয়ে গেলেন, বসে থাকলেন তাঁর হাতাওয়ালা বনেদী চেয়ার খানায়। অশ্রুসিক্ত চোখে মা বিদায় দিলেন। জীবনে কখনো বাবার চোখে জল দেখার ভাগ্য হয়নি। আজ দেখলাম বাবার দুচোখ লাল বর্ণ ধারণ করেছে আর গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে দু’ফোটা অশ্রু। বিদায়কালে বাবার মুখ থেকে মাত্র তিনটি শব্দ বেরুলো- পৌঁছেই ফোন করিস।
আমাদের বাড়ি থেকে আমার কর্মস্থলের দূরত্ব চার সাড়ে চার ঘন্টার পথ। বাসে পা ওঠাতে যাবো তখনই মায়ের ফোন-
— হ্যালো মা, বলো।
— কি রে, গাড়ি ছেড়েছে?
— এখনই ছাড়বে। রাখি মা, পৌঁছে ফোন দেবো।
ঘন্টাখানেক সময় গাড়ি চলেছে, এর ই মধ্যে আবার মায়ের ফোন-
— হ্যালো মা, বললাম তো পৌঁছেই ফোন দেবো।
— তোর বাপ যে জানতে বললো, তাই ফোন দিলাম।
— মা বিরক্ত করোনা, তোমরা খাওয়া দাওয়া সেরে ঘুমাও। আমি পৌঁছেই জানাবো।
চার ঘন্টার মধ্যে ছয়বার মা-র ফোন ধরতে হলো। প্রতিবার মায়ের প্রশ্ন, আমি পৌঁছেছি কি না। আমি উত্তর দিতে বিরক্তি দেখালে মা বলেন- তোর বাবা যে জানতে চায়!
কর্মস্থলে পৌঁছাতে রাত বারোটা বেজে গেলো। চা বাগানের আমার নির্দিষ্ট বাংলোয় নিয়ে গেলো একজন চা শ্রমিক। পৌঁছেই ফোন করলাম। ফোন ধরলেন বাবা।
— হ্যালো, তুই পৌঁছেছিস?
— হ্যাঁ বাবা। মা কোথায়?
— তোর মা এইমাত্র শুয়েছে। তুই খাওয়াদাওয়া করে শুয়ে পড়।
— ঠিক আছে বাবা, রাখি।
বাবা আর কিছু না বলেই ফোন রেখে দিলেন।
পরদিন সকালে কাজ বুঝে নিতে বাগানের অফিসে যাবো। আমার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে রাতের সেই চা শ্রমিক। ব্যাগ খুলে জামাকাপড় বের করতে গিয়ে আমি অবাক! বাবার অতি প্রিয় কাশ্মিরী শাল খানা আমার ব্যাগে।
আমাদের বনেদীয়ানার পড়তি দশা শুরু হলেও বাবা তা মেনে নিতে পারতেন না। তিনি বাড়িতে সবসময় একটি হাতাওয়ালা বড় চেয়ারে বসতেন। বসে গড়গড়ায় তামাক টানতেন। এই চেয়ারে নাকি তাঁর দাদা, পরদাদা বসে জমিদারী চালাতেন। বাবা সাদা পাজামা পাঞ্জাবি পরে কাশ্মিরী শাল খানা কাঁধে তুলে বেরুতেন। সঙ্গে থাকতো তাঁর বিশ্বস্ত চাকর হাসমত আলী। ভাব টা যেনো জমিদার তার নায়েবকে সঙ্গে নিয়ে জমিদারি তদারকিতে বেরিয়েছেন!
বাবার সেই শাল খানা আমার ব্যাগে দেখে সাথে সাথে ফোন দিলাম। মা ফোন ধরলেন।
— হ্যালো, বাবা কেমন আছিস?
— মা, বাবার শাল খানা আমার আমার ব্যাগে কে রাখলো?
— তুই শীতে কষ্ট পাবি ভেবে তোর বাবা’ই রেখেছে।
— মা তুমি বাবাকে ফোনটা দাও।
মা বাবাকে ফোন দিলেন। বাবা হ্যালো হ্যালো বলে যাচ্ছেন। আমার মুখ দিয়ে কোনো কথা বেরুচ্ছে না। মিনিট দেড়েক পর অতি কষ্টে শুধু একটি শব্দ বেরুলো, বা-বা!
——–///——–

© হোসেইন আহমদ চৌধুরী, বিয়ানীবাজার, সিলেট।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top