বিয়ের পর

#বিয়ের_পর
#শম্পা_সাহা

“কি রে ,কি হলো?চুপ করে আছিস কেন? কি রে?”

কনুই দিয়ে রক্তিমাকে একটু ঠ‍্যালা দেয় চন্দন।

রোজকার মত ওরা দেখা করতে এসেছে।মৌলালীর রাম লীলা ময়দানের যে সিমেন্টের ছাউনি মতন,তার উপরের দুখানা বেঞ্চের একখানাতে ওদের প্রায় রোজই দেখতে পাওয়া যায়।

ওদের সম্পর্ক প্রায় দেড় বছর গড়াতে যায়।চন্দন ভীষণ পসেসিভ,এবং কেয়ারিংও বটে।রক্তিমার সব কিছুতেই ওর ভীষণ খেয়াল।আর একদিন দেখা করবো না, বলার উপায় নেই রক্তিমার।তাহলে ফোন করে করে চন্দন পাগল করে দেবে।

আজ ওর আসবার একটুও ইচ্ছে ছিল না। আজ ও কলেজও যায়নি।কিন্তু চন্দনের ফোনের ঠ‍্যালায় শেষ পর্যন্ত আসতেই হলো।

“কি রে,বল কি হয়েছে?” চন্দন আবার খোঁচায়।
“আমার খুব দাঁতে যন্ত্রনা হচ্ছে, কথা বলতে ভালো লাগছে না!” সে কি ,এতক্ষণ বলিস নি কেন?ওষুধ খেয়েছিস?”,”না”, ,চন্দনের কথায় ছোট্ট করে ঘাড় নাড়ে রক্তিমা।

“চল,চল,চল আমার সঙ্গে।”হঠাৎই উঠে দাঁড়িয়ে চন্দন রক্তিমার হাত ধরে টানতে শুরু করে।”এই,ছাড় লোকে দেখছে”!ওদের এই হাত টানাটানি দেখে দুয়েকজন ওদের লক্ষ্য করছে দেখে লজ্জা পায় রক্তিমা।

“দেখুক ,আমার কিচ্ছু যায় আসে না।তুই এক্ষুনি ডাক্তারের কাছে যাবি।তোকে যেতেই হবে।ওঠ ওঠ।”

রক্তিমা চন্দনের বাড়াবাড়িতে অস্বস্তিতে পড়ে।”আজ তাহলে আমি বাড়ি যাই।মা কে নিয়ে একটু ডাক্তার দেখিয়ে নিই।তোর সঙ্গে যাওয়াটা ঠিক হবে না।”

বিষয়ের গুরুত্ব বিবেচনা করে চন্দন রক্তিমার প্রস্তাবে রাজি হয়।কিন্তু ওকে ওদের বাড়ির বাসস্টপে নামাতে ভোলে না।এবং বার বার ফোন করে খোঁজ নিতে থাকে,’ডাক্তার কি বললো,ওষুধ খেয়েছে কিনা?ব‍্যথা এখন কেমন ইত্যাদি ইত্যাদি!’
চন্দনের এই কেয়ারিং ব‍্যাপারটাই রক্তিমার ভীষন ভীষন ভালো লাগে।

“উঃ,প্রচন্ড পেটে ব‍্যথা করছে গো”।রক্তিমা পেটের যন্ত্রনায় কাতরাতে থাকে।সকালে উঠে কোনো রকমে শরীরটাকে টেনে টেনে অফিসের রান্না সেরেছে।কিন্তু এখন আর সত‍্যিই দাঁড়াতে পারছে না।ওর যেন ঘাম দিচ্ছে।পা কোমর ভয়ংকর যন্ত্রনায় যেন আড়ষ্ট।

আসলে ওর ওভারিয়ান সিস্ট ধরা পড়েছে, হয়তো সেজন্যই ব‍্যথা।এ কদিন তাই রক্তিমা খুব অসহায় বোধ করে।মনে হয় হট ব‍্যাগ নিয়ে যদি শুয়ে থাকতে পারতো তো বেশ হতো।

কোনরকমে প্লেটে চন্দনের খাবার বেড়ে ও গিয়ে শুয়ে পড়ে।”তুমি ব‍্যথার ওষুধটা খাওনি?” চন্দন খেতে খেতেই প্রশ্নটা ছুঁড়ে দেয়।কিন্তু রক্তিমা আর উত্তর দিতে পারে না।তলপেট চেপে শুয়ে থাকে।একটু হটব‍্যাগ দিতে পারলে আরাম হত! কিন্তু এখন কে করবে?

“তেমন প্রয়োজন হলে ডাক্তারকে একটা ফোন করে নিও কেমন?”রক্তিমার মাথায় আলতো হাত বুলিয়ে বেরিয়ে যায় চন্দন।

‘মাত্র তিন বছরে মানুষ এতো বদলে যায়?যে মানুষটা বিয়ের আগে, রাস্তা দিয়ে হাঁটলে যেন বুক পেতে দিতে চাইতো,সামান্য দাঁতের ব‍্যথায় কাতর হয়ে পড়তো আর আজ! এতো কষ্টে ওকে একা ফেলে চলে গেল!’ভয়ংকর অভিমানে চোখ ফেটে জল আসে রক্তিমার।

চন্দন রাস্তায় বেরিয়ে খেয়াল করে আজ ওর টিফিনটা রক্তিমা দিতে ভুলে গেছে।”আগে যে মেয়েটা সামান‍্য খু‍ঁটিনাটির খবর রাখতো,খেলাম কি খেলাম না?ঠিকমতো জল খেয়েছি কিনা? তাতেও তার কড়া নজর ছিল, আজ সারাদিন ও না খেয়ে থাকবে জেনেও টিফিনটা দিল না। রক্তিমা ভালোই জানে আমি আলসার হবার পর থেকে বাইরের খাবার ছুঁই না’! একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে আসে চন্দনের বুক চিড়ে।

আসলে বিয়ের কয়েকবছর পর নিত‍্যকার অভ‍্যাসে ভালোবাসাটা ফিকে হয়ে আসে কিন্তু হারিয়ে যায় না কখনো।তাই তো এত কিছু মান অভিমান,পাওয়া না পাওয়ার পরও আমরা প্রত‍্যাশা করি সব কিছু আবার একদিন আগের মত হয়ে যাবে।এবং সেই আশা নিয়েই হয়তো সব কটা সংসার এখনো ভেঙ্গে না গিয়ে চলছে হোঁচট খেতে খেতে হলেও।

©®

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top