মাধবী

মাধবী

একজনই তুমি আছ আমার পৃথিবীতে, যে আমাকে বুঝতে পারে একান্ত নিজের করে। যে আমাকে দেখে দূর থেকে অনেক কাছের করে।

আজ কয়েকদিন ধরেই তোমাকে খুব লিখতে ইচ্ছে করছে। যা-ই লিখি, তোমাকে পাঠাই না পাঠাই — কিন্তু লিখতে ইচ্ছে করছে। আজ সকালে দরজা খুলে প্রথম যে রোদ দেখেছিলাম, সেখানে কোনো মেঘের ছায়া ছিল না, স্বচ্ছ ও ঝিলমিল রোদ্দুর ছিল। ধুলিমাখা দুর্বা ঘাসের মাঠের উপরে একটি শালিক লাফিয়ে চলছিল এদিক ওদিক। কোনো শীষ নেই। সেও কী বেদনাময় একা। সেও কী অভিমানী হয়ে একা একা ঘুরছে ফিরছে?

তোমাকে লিখতে যেয়ে কিছুক্ষণ লেখা থামিয়ে দেই। বহু বছরের পুরনো একটি কাঠের তোরঙ্গ বের করি। অনেক জীর্ণ অভিজ্ঞান ভরা সে তোরঙ্গ । কয়েকটি বইও আছে। তার একটি “কুর্চি বনের গান”। প্রথম পাতা উল্টাতেই দুলাইনের তোমার লেখা —

“যতবার তোমার কাছে আসতে চাই,
ততবারই আমি দূরে চলে যাই, এত দূরে যাই যে সে এক অসীম অনন্তপুর।
তুমি কখনোই অত দূরে আসবে না জানি।”

এই বৈশাখের সকালে এত সুন্দর রোদের ভিতর তোমার ছায়া খুঁজতে থাকি। পাতা ঝরে পড়ছিল বৃক্ষরাজি থেকে। হঠাৎ কেমন বিবাগী মন হয়ে উঠেছে আমার। বইয়ের পাতাগুলো জীর্ণ পাতার মতো মর্মর করছে। সেই কবেকার এক দুপুরের কথা মনে পড়ছিল —

সেদিন ছিল আমার জন্মদিন। কিন্তু আমার মনে ছিল না। তখন কেউ এইদিন আজকের দিনের মতো করে মনে রাখত না। কিন্তু তুমি মনে রেখেছিলে। তুমি তোমাদের বাসা থেকে পায়েস ও পরোটা করে এনেছিলে। আমার পকেটে একটি টাকাও ছিল না। হলের ক্যানটিনে না ঢুকে সোজা ক্লাসে চলে এসেছিলাম। হেনা স্যারের ক্লাস শেষ করে লাইব্রেরি বারান্দায় দুজন যেয়ে বসি, তুমি পরোটা ছিড়ে ছিড়ে পায়েস পুরে আমাকে দিচ্ছিলে। তারপর খাওয়া শেষে তুমি আমাকে দিলে — “কুর্চিবনের গান”।

লেখার নীচে তোমার নাম নেই। তুমি আমার কেউ ছিলে না, তারপরও গোপন করে রেখেছিলে তোমার কথা। আমি ছিলাম একটা ইডিয়ট, অনেক গোপনের অর্থ বুঝতাম না। মানুষের অনেক নীরব অভিব্যক্তিও। তারপরও তুমি বলেছিলে সেদিন, কিছু একটা বলো। কিছুই বলিনি সেদিন। আমি যেটি পারতাম তাহলো কবিতা — লিখে এনেছিলাম না খাতায়। এমনি মুখে মুখে বলেছিলাম। সব কথা, সব শব্দ আজ আর মনে নেই। অনেকটা এমন ছিল মনে হয় — নীচের এমনটাই হয়ত বলতে চেয়েছিলাম সেদিন, তা না বলে বলেছিলাম অন্য কথা, অন্য কবিতা —

” চপল ঢেউয়ের মতো এঁকেবেঁকে
পুষ্প কানন থেকে মাধবীলতা আসলেন
হঠাৎ সজল বাতাসে উন্মুখ হয়ে উঠল এক ভ্রমর।

মাধবী তার পদ্মযৌবন পাপড়ি মেলে ধরলেন
কোনো বিষাদ নেই, সে যেন উতলা হয়ে আছে
বিস্মরণের এক রমণীর মতো।

বহুকাল পরে ভ্রমর যেন প্রাণ পেলেন মাধবীর পুষ্পিত দেহ বল্লরীর সৌরভে, এবং স্নাত হলেন
তার অন্তঃপুরের সকল ধারায়।”

আজ নিজেকে বলছি স্বগোতক্তি করে — হে আহম্মক, এই কথা তুই বলিসনি সেদিন। এই কথা বললে কী তোর মাধবী এত দূরে চলে যায়!

কাউকে ভালোবাসতে চাইলে পরিকল্পনা করে ভালোবাসতে নেই। ভালোবাসা হতে হয় নদীর জলের মতো স্বচ্ছ ও গতিময়। চলবে স্রোতের টানে, ভেসে নিয়ে যাবে, যতদূরেই থাক মোহনা। তবে ভালোই করেছ, আমাকে ভাল না বেসে। জীবনের কোনো সফল প্রাপ্তি পেতে না তুমি। এ যে অপ্রাপ্তিতেই গড়িয়ে যেত। তার সব কিছুই আজ মূল্যহীন হয়ে যেত। ভালোই করেছ মূর্খ্যামী না করে।

মাধুকরীতে বুদ্ধদেব গুহ লিখেছিল — হুসের মানুষদের কপালে ভালোবাসা জোটে না। যারা হারাবার ভয় করে না কিছুতেই, একমাত্র তাঁরাই ভালোবেসে সব হারাতে পারে। অথবা অন্যদিক দিয়ে দেখলে মনে হয়, যাকিছুই সে পেয়েছিলো বা তাঁর ছিলো, সেই সমস্ত কিছুকেই অর্থবাহী করে তোলে ভালোবাসা। যে ভালোবাসেনি তাঁর জীবন বৃথা। তবুও বড় কষ্ট ভালোবাসায়। এমন মহা বোধ আর কি আছে?”

আজ আর কিছু লিখতে ইচ্ছে করছে না। মন কেমন উড়ো উড়ো লাগছে। জানি না তুমি এখন কী করছ? আবারও স্বপ্নের কথা চলে আসছে। জীবন মানুষের দুবার আসে না। একবারই আসে ক্ষণকালের জন্য এই মহাকালের পৃথিবীতে। তুমি একবার তোমার একটি চিঠিতে লিখেছিলে, “…. যদি তুমি আসো একবার এখানে — তোমাকে নিয়ে দানিয়ুব নদীর পাড়ে বেড়াতে নিয়ে যাব। একপাশে আছে পাহাড়, সেই পাহাড়ের ঢালে ফুটে থাকে অজস্র রডোডেনডন গুচ্ছ। আমরা দুজন বিমুগ্ধ হয়ে দেখব নদীর জল, পাহাড় আর রডোডেনডন। ”

না গো মাধবী, এই জীবনে আমার আর রডোডেনডন দেখতে ইচ্ছে করছে না। আজ এই অস্তবেলায় তোমাকে নিয়ে কুর্চিবনে যেতে ইচ্ছে করছে। তুমি জানাইও তোমাদের দানিয়ুব নদীর কূলে কোনো কুর্চিবন আছে কী না?

ভোরের আলোয় পথ চিনে বেরিয়ে পড়েছি পথে। কোথা’ থেকে ভেসে আসছে অচেনা সুবাস, কেমন এক অস্পর্শ ফুল ফুটে আছে কোন্ সুদূরের কুসুম কাননে।
আমি তার আরক্ত পরাগ রেণূতে ছুঁয়েছি ঠোঁট, যেন প্রজাপতি প্রথম পালক রেখে গেল পত্রপল্লবে। এমন লাজুক প্রস্ফুটিত পাঁপড়িতে বসেনি এর আগে
কোনও উড়ন্ত মৌমাছি থামিয়ে দিয়ে ডানা, শুষে নিতে পারেনি এর মধুরিমা।

আজ আর কোনো পত্র লেখা হলো না তোমাকে। ভালো থেকো তুমি মাধবী।

— রঞ্জন।
______________________________
কোয়েল তালুকদার

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top