রবীন্দ্রনাথের নৃত্যভাবনায় নন্দনতত্ত্ব

রবীন্দ্রনাথের নৃত্য ভাবনায় নন্দনতত্ত্ব :
————————————
সৌম্য ঘোষ
———–
রবীন্দ্রনাথের নৃত্যভাবনা শিল্পকলায় তার নন্দনতন্ত্রের স্বরূপটি নান্দনিক সৌন্দর্য সৃষ্টির মানসে রবীন্দ্রনাথ গ্রহণ-বর্জন, বিন্যাস, ঐক্য প্রভৃতির কথা বলেছেন। তার মতে মানুষ অন্ধভাবে প্রকৃতিকে অনুসরণ করে না, তার সঙ্গে কল্পনার ছোয়া মিশিয়ে আপন মনের মাধুরী দিয়ে তাকে পরিবর্তিত করে নতুন রূপে প্রকাশ করে। প্রকৃতিতে যা দেখি তা প্রত্যক্ষ দেখি, কিছু শিল্পকর্মে দেখি সম্পূর্ণ নতুন চিত্র। মানুষের চেতনা প্রকৃতির বিচিত্র লীলার যে ইন্দ্রিয়দত্ত অনুভূতি পায় সেই অনুভূতিকে নিজস্ব একটা রূপ আরােপকে নতুন ভাবে প্রকাশ করে। শিল্পীর মনে যা অপ্রত্যক্ষ ছিল তাই সেখানে প্রকাশ পায়। এখানে কাজ করে গ্রহণ বর্জন আত্মীকরণের নীতি। তাই তার ভাবনায়,

“আমারই চেতনার রঙে পান্না হল সবুজ,
চুনি উঠল রাঙা হয়ে।
আমি চোখ মেললুম আকাশে,
জ্বলে উঠল আলো পুবে পশ্চিমে
গোলাপের দিকে চেয়ে বললুম “সুন্দর’,
সুন্দর হল সে।”

তিনি বলেছেন যে, সাহিত্য ঠিক প্রকৃতির আরশি নয়। কেবল সাহিত্য কেন, কোন কলা বিদ্যাই প্রকৃতির যথাযথ অনুকরণ নয়। প্রকৃতিতে প্রত্যক্ষকে প্রতীতি করা যায়, সাহিত্যে ও ললিতকলার ক্ষেত্রে অপ্রত্যক্ষকে প্রভাতি করা যায়। সাহিত্যে ও ললিতকলায় অপ্রত্যক্ষ হয় প্রতীয়মান। কবির এই ভাবনা সকল শিল্পকার ক্ষেত্রেই প্রযােজ্য। যেমনটা আছে তেমনটাই ভাব হচ্ছে তথ্য, সেই তথ্য যাকে অবলম্বন করে থাকে সেই হচ্ছে সত্য। গ্রহণ বর্জনের মধ্যে দিয়ে সেই তথ্য যখন কল্পনার রসে জারিত হয়ে স্বতন্ত্র সৃষ্টিতে রূপাপ্তরিত হয় তখনই সেটা হয় বিন্যাস। আর গ্রহণ-বর্জন বিন্যাসের মধ্য দিয়ে একটা সামগ্রিক ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়। শিল্পকর্ম বা সুন্দর বস্তুর বিভিন্ন অংশের মধ্যে একটা সামঞ্জস্য থাকে। রবীন্দ্রাথ এই সামগ্রিক ঐক্যকে বলেন সুমিতি। এই সুমিতিতে আর্টের সম্পূর্ণতা। শিল্পকলার মধ্যে যে আভ্যন্তরীণ সুমিতি বিরাজ করে তাই আনন্দ দেয়। যা আনন্দ দেয় তাকেই মন সুন্দর বলে।
নন্দনতত্ত্বের সাধারণ সূত্র ধরেই জীবনের উপকরণ গুলিকে সংযম সুসীমিত করে ঐক্যবদ্ধ করাও বিশেষ প্রয়ােজন। রবীন্দ্রনাথের নৃত্য ধারার ভাবনার মূল লক্ষ্য ঐক্য। যদি কোনাে উপকরণ বড় হয়ে ওঠে ঐক্যকে বিনষ্ট করে তবে নান্দনিক আবেদন ব্যর্থ হয়। রসবাদের উপর দাড়িয়ে আছে নন্দন তত্ব। গ্রহণ বর্জন, বিন্যাস, ঐক্যের মাধ্যমে যে শিল্প সৃষ্টি হয় তাই নন্দনতত্বের মূল সুর। কাব্য, নাট্য, সংগীত (নৃত্য গীত বাদ্য), চিত্রকলায় সুসমন্বয়ে ঐক্য সৃষ্টি হল রবীন্দ্রনাথের নৃত্য ভাবনা।

ঊনবিংশ শতাব্দীতে হিন্দু কলেজের প্রতিষ্ঠাতার পর সাংস্কৃতিক নবজাগরণের যুগে রামমােহন, বিদ্যাসাগর, মাইকেল, প্রমুখ মনীষীদের দানে সামাজিক প্রগতি সূচিত হল। নাট্যশালা ও নাটকের পথ হল উন্মুক্ত। কিন্তু তখনও নৃত্যকলার পথ রুদ্ধ। কোনরকমে গ্রামবাংলায় লােকসংস্কৃতি
টিকে রইল। শিক্ষিত সমাজের কাছে নৃত্য হল অবহেলিত। ফলে এর মান হল নিম্নগামী। শুধমাত্র রােজগারের আশায় মনােরঞ্জনের জন্য নিষিদ্ধ পল্লীতে এর ধারা হল সীমাবদ্ধ। শিক্ষিত সমাজের এই অবহেলাকে সমাজের পূর্ণাঙ্গ বিকাশের পথে গুরুতর ক্রটি বলেই গুরুদেব মনে করেছিলেন।
ভারতীয় সংস্কৃতির প্রাচীনতম ধারা এই নৃত্যকলাকে শিক্ষার অন্যতম বাহন বলে স্বীকার করে নিয়ে শান্তিনিকেতনে একে মর্যাদার আসন দিলেন। নৃত্যগীতকে বুদ্ধি বৃত্তির সঙ্গে চিত্তবৃত্তির সংযােগ ঘটালেন। শুধুমাত্র নাচিয়ে তৈরি করা গুরুদেবের উদ্দেশ্য ছিল না। তার উদ্দেশ্য ছিল প্রকৃত শিক্ষা যেমন সমাজ জীবনকে উন্নত করে তােলে নৃত্যকলাও যেন তাই করে। তিনি তাকে দিয়েছিলেন মুক্তি, বৈয়াকরণিক এর বেড়াজাল থেকে। তার মতে গদ্য ভাষায় যেমন প্রচ্ছন্নভাবে ছন্দ থাকে, তেমনি মানুষের সহজ চলায় অব্যক্ত থাকে নৃত্য। নাচ শুধুমাত্র অভিব্যক্তি প্রকাশ নয় নৃত্যের মাধ্যমে প্রকাশিত হয় জীবনের গভীর জীবন নৃত্যের একটি অখণ্ড ছন্দে ছন্দিত হয়ে এক সূত্রে বাঁধা পড়ে সৌন্দর্য বর্ধন করে। বিশ্বের মধ্যে যে ছন্দ আছে, গতি আছে, সেগুলিকে আশ্রয় করে স্রষ্টা যখন সৃষ্টি করে তখনই সে এক নান্দনিক সৌন্দর্য বর্ধন করে। মানুষ যুক্ত হয় বৃহত্তর সমাজের সঙ্গে। সেই যােগই নান্দনিক তত্বের বড় বিশেষত্ব। জীবনের এই ছন্দ বােধই কবিকে চালিত করেছে, গীতিনাট্য থেকে নৃত্যনাট্য পর্যন্ত এক অবিচ্ছেদ্য বিবর্তনের পথে। সােনার তরী, বসুন্ধরা’, চিত্রা’, পুরবী, “মহয়া প্রভৃতি কাব্যগ্রন্থে তার নৃত্য ভাবনার চিত্র ফুটে ওঠে। এর মধ্য দিয়ে রাবীন্দ্রিক নন্দনতক্রের আভাস পাওয়া যায়। নন্দন তত্ব সম্পর্কে তার ধারণা, বিজ্ঞান জগতের বিচারের মত করে সৌন্দর্যের ব্যাখ্যা করা যায় না। সৌন্দর্য জিনিসটা অনুভূতির ব্যাপার। একজনের যে জিনিসটা ভাল লাগে অন্যজনের সেটা ভালাে নাও লাগতে পারে। রুচি ভেদে ভালাে লাগা আর ভালাে না লাগার পার্থকা থাকতে পারে। প্রকৃতির মধ্যে গাছপালা, ফুল ফল, পাহাড়, নী আছে। কারাো পাহাড় ভালােলাগে, কারুর ভালাে লাগে সমুদ্র। তবে মতভেদ থাকলেও মতবিরােধ নেই। বিরােধ কেবল মানুষের সৃষ্টিতে, সাহিত্য, সঙ্গীত, চিত্রকলা ও নৃত্য ধারায়। তবে কাব্যে সাহিত্যে যাকে সুন্দর বলা হয়, জীবনের ক্ষেত্রে তাকে সবসময় সুন্দর নাও বলা যেতে পারে। বাস্তব জীবনে মৃত্যু বিচ্ছেদ কাম্য নয়, কিন্তু কাব্যে, সাহিত্যে নৃত্যগীতে, বিয়োগান্ত বিষয়বস্তু বেশি আকর্ষণ করে। তাই সর্বকালের সর্বদেশের সেরা সৃষ্টি বিয়োগান্ত ঘটনা নিয়ে। রবীন্দ্র নন্দনতত্বের মধ্যে যে মূল ভাব প্রকাশ পাচ্ছে তা হল নিজেকে প্রকাশ করা। মানুষের মনের রাজ্যে প্রতিনিয়ত নানাভাবের নানা অনুভূতির জন্ম হচ্ছে। তাই গুরুদেবের ভাষায়, “আপনাকে সে জানা আমার ফুরাবে না”। এই জানাটাই মানুষ প্রকাশ করতে চায়। রূপে রঙে সুরে বাণীতে নৃত্যে। এই প্রকাশের তাগিদেই সৃষ্টি হয়েছে রবীন্দ্রনাথের নিজস্ব নৃত্যাধারা।।
_______________________________

_______________________________

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top