রবীন্দ্র ভাবনৃত্য – সৌম্য ঘোষ

রবীন্দ্র ভাবনৃত্য
—————
সৌম্য ঘোষ
—————-

শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথের প্রত্যক্ষ সংস্পর্শে বড় হয়ে উঠেছেন এমন মুষ্টিমেয় কয়েকজন মানুষের মধ্যে আশ্রম কন্যা অমিতা সেন অন্যতম। তার আশ্রম জীবনের স্মৃতিকথা শান্তিনিকেতনে ‘আশ্রম কন্যা’ গ্রন্থে তিনি সরাসরি উল্লেখ করেছেন তার নৃত্য সম্বন্ধে নিজস্ব গভীর অনুভূতির কথা। তার লেখনীতে ফুটে উঠেছে তার অনুভূতির কথা। তিনি বলেছেন “ভাব নৃত্য রবীন্দ্রনাথের অভিনব মর্মস্পর্শী এক সৃজন। মনের ভাবটি যেমন তিনি তার গানের সুরে বইয়ে দিলেন, তেমনি তার হৃদয়ের আনন্দ-বেদনা ফুটিয়ে তুললেন নৃত্যের ছন্দে। আমাদের দেশে সংকীর্তন নৃত্যে, বাউল নৃত্যে প্রেম ও ভক্তির বন্যা বয়ে চলেছে বহুকাল ধরে। সেই ধারায় রবীন্দ্রনাথের অন্তরের রসলীলা রূপ পেল তার ছন্দে। তার নৃত্যদোলায় ঝরে পড়ে বর্ষার ধারা, বসন্তে ফুটে ওঠে পুষ্পকলি, নব কিশলয়ে লাগে হিল্লোল, শুকনােপাতা ছড়িয়ে পড়ে, কোন দূরে দূরে উদ্বেলিত হয়ে ওঠে আনন্দ, মনের বেদনা ওঠে বেজে। অপূর্ব ভাব নৃত্য তার। যাৱা না দেখেছেন তাদের বােঝানোর ক্ষমতা নেই, আমার ভাষা যোগাবে না।”।

এই ভাব নৃত্য তিনিই শেখাতেন বালিকাদের। মনের আবেগে রচনা করেছেন নতুন নতুন গান, সেই গান ফুটিয়ে তুলেছেন নৃত্যে। সেই নৃত্য মেয়েরা শিখেছে তারই কাছে। মনে পড়ে ঋতুরঙ্গের মহড়া চলেছে। রচনা করলেন, ‘শ্রাবণ, তুমি বাতাসে কার আভাস পেলে’। পরদিন উদয়নে শেখাচ্ছেন সেই গানের ভাব নৃত্য মেয়েদের ‘কদম ঝরে হায় হায় হায়’ । মুগ্ধ নয়নে আমরা দেখছি তার হাতের ভঙ্গিতে ঝরে পড়ছে ফুল। ‘হিমগিরি ফেলে নিচে নেমে এলে’ শীত ঋতুর এই গানে শেখাচ্ছেন আগুন পােয়ানাের নাচ, ঘুরে ঘুরে হাত দুখানি আগুনের উপর নানা ভঙ্গীতে মেলে ধরেছেন, কখনাে বসে কখনাে দাড়িয়ে। কি অপরূপ আগুন পােহানাের নাচ, এরকম কত কত গানে নৃত্য শিক্ষার ছবি মনে গাঁথা হয়ে আছে।

ক্রমে এল টেকনিকের যুগ, নানা দেশের নাচের টেকনিক শেখানাে শুরু হল রবীন্দ্রনাথের আগ্রহে এবং ব্যবস্থায়। রবীন্দ্র নৃত্য ক্রমশ আরাে স্বার্থক ভাবে ফুটে উঠল কবির নির্দেশনায়। শিশু যতদিন হাঁটতে না শেখে মায়ের কোলে আশ্রয়টি সে পায়, হাঁটতে শিখলে মায়ের স্নেহ সতর্ক দৃষ্টি তাকে ঘিরে রাখে, কিন্তু মায়ের কোলটি সে হারায়। আমরাও সেইভাবে রবীন্দ্রনাথের নৃত্যের নিবিড় কোলটির স্পর্শ হারালাম। রবীন্দ্রনাথের নির্দেশনায় ভাবনায় পরিকল্পনাতেই নৃত্য গড়ে উঠেছে তার শেষ দিন পর্যন্ত। কিন্তু গানের প্রথম কলি থেকে শেষ কলি পর্যন্ত নিজে গেয়ে, নিজে নেচে হাত ধরে নাচ শেখানে ক্রমশই তাঁর থেকে ক্ষীণতর হয়ে এল। চরমতম দুঃখের বিনিময়ে নৃত্যের পরমতম উৎকর্ষের বিকাশ হল রবীন্দ্রনাথের সহায়তায়। রবীন্দ্রনাথ তাঁর সেকাল’ কবিতায় লিখেছেন,

“আমি যদি জন্ম নিতেম
কালিদাসের কালে
দৈবে হতেম দশম রত্ন
নবরত্নের মালে—
একটি শ্লোকে স্তুতি গেয়ে
রাজার কাছে নিতাম চেয়ে
উজ্জয়িনীর বিজন প্রান্তে
কানন-ঘেরা বাড়ি।
রেবার তটে চাঁপার তলে
সভা বসত সন্ধ্যা হলে,
ক্রীড়াশৈলে আপন-মনে
দিতাম কণ্ঠ ছাড়ি।
জীবনতরী বহে যেত
মন্দাক্রান্তা তালে
আমি যদি জন্ম নিতাম
কালিদাসের কালে॥”
_______________________________

লিখেছেন:— অধ্যাপক সৌম্য ঘোষ।
চুঁচুড়া। হুগলী।
_______________________________

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top